কলকাতা: দুর্গাপুজোর আনন্দের মধ্যেই উত্তর কলকাতার চোরবাগান সর্বজনীন পুজোমণ্ডপে ঘটে গেল মর্মান্তিক দুর্ঘটনা। শনিবার সন্ধ্যায় প্রবল ভিড় ও বৃষ্টির মধ্যে পদপিষ্ট হওয়ার ঘটনায় এখনও পর্যন্ত ১৭ জনের মৃত্যুর খবর পাওয়া গিয়েছে। আহত হয়েছেন আরও অনেকে। তাঁদের মধ্যে বেশ কয়েকজনকে কলকাতা মেডিক্যাল কলেজ ও হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। এই ঘটনায় উৎসবের আবহ মুহূর্তের মধ্যে শোক ও আতঙ্কে বদলে যায়।
কীভাবে ঘটল দুর্ঘটনা?
Chorebagan Sarbojanin Puja Stampede 2026
স্থানীয় সূত্র ও প্রত্যক্ষদর্শীদের বয়ান অনুযায়ী, চোরবাগান সর্বজনীনের মণ্ডপে প্রতিমা দর্শনের জন্য সন্ধ্যার দিকে বিপুল সংখ্যক মানুষের ভিড় জমেছিল। সেই সময় বৃষ্টি শুরু হলে ভিড়ের মধ্যে বিশৃঙ্খলা তৈরি হয়। আচমকা ধাক্কাধাক্কি ও হুড়োহুড়িতে একাধিক দর্শনার্থী মাটিতে পড়ে যান। তাঁদের উপর অন্য দর্শনার্থীরা পড়ে যাওয়ায় পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে ওঠে।
মণ্ডপের গেটের একটি অংশ ভেঙে পড়ার খবরও সামনে এসেছে। তবে গেট ভেঙে পড়া, বৃষ্টির কারণে মানুষের একসঙ্গে সরে যাওয়ার চেষ্টা এবং মাইকে ঘোষণার ভূমিকা-এই সমস্ত বিষয় দুর্ঘটনার সঙ্গে কীভাবে যুক্ত ছিল, তা এখনও তদন্তসাপেক্ষ।
এক প্রত্যক্ষদর্শী সংবাদমাধ্যমকে জানান, তিনি বন্ধুদের সঙ্গে ঠাকুর দেখতে এসেছিলেন। ভিড়ের চাপে তাঁর সঙ্গে থাকা কয়েকজন মাটিতে পড়ে যান এবং দীর্ঘক্ষণ তাঁদের উদ্ধার করা কঠিন হয়ে পড়ে। পরে স্থানীয় বাসিন্দাদের সাহায্যে তাঁদের বের করে আনা হয়। প্রত্যক্ষদর্শীদের একাংশের অভিযোগ, ঘটনাস্থলে ভিড় নিয়ন্ত্রণ ও দ্রুত উদ্ধারকাজের পর্যাপ্ত ব্যবস্থা ছিল না। যদিও এই অভিযোগগুলির সত্যতা তদন্তের পরই স্পষ্ট হবে।
হাসপাতালে আহতদের চিকিৎসা, বন্ধ পুজোমণ্ডপ
দুর্ঘটনার পর আহতদের উদ্ধার করে কলকাতা মেডিক্যাল কলেজ ও হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী হাসপাতালে গিয়ে আহতদের চিকিৎসার খোঁজ নেন। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, আহতদের মধ্যে অধিকাংশের অবস্থা স্থিতিশীল হলেও একজনের অবস্থা আশঙ্কাজনক ছিল। মৃতের সংখ্যা নিয়ে প্রথম দিকে বিভিন্ন রিপোর্টে ভিন্ন তথ্য প্রকাশিত হয়েছিল; সর্বশেষ প্রকাশিত প্রতিবেদনে মৃতের সংখ্যা ১৭ বলে জানানো হয়েছে।
দুর্ঘটনার পর চোরবাগান সর্বজনীনের মণ্ডপে দর্শনার্থীদের প্রবেশ বন্ধ করে দেওয়া হয়। ঘটনাস্থল পরীক্ষা করে দুর্ঘটনার কারণ নির্ধারণের জন্য তদন্তের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। পুজো কমিটির ভূমিকা, ভিড় নিয়ন্ত্রণের ব্যবস্থা এবং নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা ব্যক্তিদের কাজও খতিয়ে দেখা হবে।
মৃতদের পরিবারকে ২৫ লক্ষ টাকা ও সরকারি চাকরির ঘোষণা
দুর্ঘটনার পর রাজ্য সরকারের তরফে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলির জন্য আর্থিক সহায়তার ঘোষণা করেছেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। ঘোষণামতো, প্রত্যেক মৃতের পরিবারকে ২৫ লক্ষ টাকা ক্ষতিপূরণ এবং পরিবারের একজনকে সরকারি চাকরি দেওয়া হবে। আহতদের চিকিৎসার সম্পূর্ণ ব্যয়ভার রাজ্য সরকার বহন করবে এবং প্রত্যেক আহতকে ৫ লক্ষ টাকা করে আর্থিক সহায়তা দেওয়ার কথাও জানানো হয়েছে।
প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীও মৃতদের পরিবারের জন্য প্রধানমন্ত্রীর জাতীয় ত্রাণ তহবিল থেকে ২ লক্ষ টাকা এবং আহতদের জন্য ৫০ হাজার টাকা করে আর্থিক সহায়তার ঘোষণা করেছেন বলে সংবাদমাধ্যমে জানানো হয়েছে।
নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়ে উঠছে প্রশ্ন
এই দুর্ঘটনার পর বড় পুজোমণ্ডপে ভিড় নিয়ন্ত্রণ, জরুরি নির্গমনপথ, বৃষ্টির সময় নিরাপত্তা এবং মাইকে ঘোষণার সমন্বয় নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে। বিশেষত, দর্শনার্থীদের প্রবেশ ও বেরোনোর পথ আলাদা রাখা, ভিড়ের চাপ পর্যবেক্ষণ এবং জরুরি পরিস্থিতিতে দ্রুত চিকিৎসা ও উদ্ধার পরিষেবা পৌঁছে দেওয়ার ব্যবস্থা কতটা কার্যকর ছিল, তা খতিয়ে দেখা জরুরি।
তবে কারও বিরুদ্ধে চূড়ান্ত দায় নির্ধারণের আগে তদন্তের ফলের জন্য অপেক্ষা করা প্রয়োজন। দুর্ঘটনার প্রকৃত কারণ এবং কোনও কর্তব্যে গাফিলতি ছিল কি না, তা নিরপেক্ষ তদন্তেই স্পষ্ট হবে।
দুর্গাপুজোর আনন্দের দিনে এমন মর্মান্তিক ঘটনা বহু পরিবারকে গভীর শোকের মুখে ঠেলে দিয়েছে। এই মুহূর্তে আহতদের যথাযথ চিকিৎসা, নিহতদের পরিবারের পাশে দাঁড়ানো এবং ভবিষ্যতে এমন দুর্ঘটনা এড়াতে কার্যকর নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিশ্চিত করাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।