কলকাতা: চলচ্চিত্রপ্রেমীদের জন্য দশ দিনের এক বর্ণময় সফরের অবসান হল। শহর থেকে প্রান্তিক গ্রাম-বিভিন্ন জায়গায় চলচ্চিত্র প্রদর্শনের মধ্য দিয়ে সাফল্যের সঙ্গে আয়োজিত স্বামী বিবেকানন্দ আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসব (SVIFF)-এর সমাপ্তি অনুষ্ঠান অনুষ্ঠিত হল ১৪ সেপ্টেম্বর, ২০২৬। কলকাতার বিশিষ্ট ফিল্ম অ্যাকাডেমি iLEAD-এর অডিটোরিয়ামে আয়োজিত বর্ণাঢ্য সমাপনী অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন দেশ-বিদেশের বিশিষ্ট চলচ্চিত্র নির্মাতা, শিল্পী ও কলাকুশলীরা।
এবারের উৎসবের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য মুহূর্তগুলির মধ্যে ছিল বাংলা চলচ্চিত্রের দুই প্রবীণ ব্যক্তিত্বকে বিশেষ জীবনকৃতি সম্মান প্রদান। অভিনেত্রী ও নৃত্যশিল্পী মমতা শঙ্কর পেলেন ধীরেন্দ্রনাথ গাঙ্গুলি লাইফটাইম অ্যাচিভমেন্ট অ্যাওয়ার্ড। অন্যদিকে প্রবীণ চলচ্চিত্র পরিচালক বীরেশ চট্টোপাধ্যায়-এর হাতে তুলে দেওয়া হয় হীরালাল সেন অ্যাওয়ার্ড।
দশ দিনের চলচ্চিত্র উৎসব, শহর ছাড়িয়ে প্রান্তিক এলাকাতেও
বিবেকানন্দ ব্রাদারহুড অ্যান্ড ইয়ুথ ফাউন্ডেশন এবং ফিল্ম অ্যাকাডেমি ‘আই লিড’ (iLEAD)-এর উদ্যোগে আয়োজিত এই দশ দিনব্যাপী চলচ্চিত্র উৎসবের অন্যতম বিশেষ দিক ছিল চলচ্চিত্র প্রদর্শনের পরিধি।
শুধু কলকাতা বা শহরকেন্দ্রিক আয়োজনের মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে উৎসবের চলচ্চিত্র পৌঁছে দেওয়া হয় শহরের পাশাপাশি প্রান্তিক গ্রামাঞ্চলেও। এর ফলে চলচ্চিত্রকে আরও বৃহত্তর দর্শকসমাজের কাছে পৌঁছে দেওয়ার পাশাপাশি নতুন শিল্পী ও নির্মাতাদের কাজকে সামনে আনার সুযোগ তৈরি হয়।
উৎসবের বিভিন্ন বিভাগে দেশ-বিদেশের বহু চলচ্চিত্র প্রদর্শিত হয়। পাশাপাশি বিভিন্ন ক্যাটাগরিতে শতাধিক চলচ্চিত্র ও শিল্পীকে সম্মানিত করা হয়।
মমতা শঙ্করের হাতে ধীরেন্দ্রনাথ গাঙ্গুলি সম্মান
বাংলা চলচ্চিত্র ও সংস্কৃতি জগতের দীর্ঘদিনের পরিচিত মুখ মমতা শঙ্কর। অভিনেত্রী হিসেবে তাঁর অভিনয় এবং নৃত্যশিল্পী হিসেবে তাঁর দীর্ঘ কর্মজীবনের স্বীকৃতিস্বরূপ এবারের উৎসবে তাঁকে প্রদান করা হয় ধীরেন্দ্রনাথ গাঙ্গুলি লাইফটাইম অ্যাচিভমেন্ট অ্যাওয়ার্ড।
সম্মান গ্রহণের মুহূর্তটি অনুষ্ঠানের অন্যতম আবেগঘন পর্ব হয়ে ওঠে। বাংলা চলচ্চিত্রের একাধিক প্রজন্মের দর্শকের কাছে পরিচিত এই শিল্পীকে জীবনকৃতি সম্মান জানানো উৎসবের মর্যাদাও বাড়িয়ে দেয়।
হীরালাল সেন অ্যাওয়ার্ড বীরেশ চট্টোপাধ্যায়ের হাতে
অন্যদিকে বাংলা চলচ্চিত্রের প্রবীণ পরিচালক বীরেশ চট্টোপাধ্যায় পেলেন হীরালাল সেন অ্যাওয়ার্ড।
ভারতীয় চলচ্চিত্রের ইতিহাসে হীরালাল সেনের নাম বিশেষভাবে স্মরণীয়। তাঁর নামাঙ্কিত এই সম্মান প্রদান করে উৎসব কর্তৃপক্ষ চলচ্চিত্র নির্মাণে বীরেশ চট্টোপাধ্যায়ের দীর্ঘ অবদানের স্বীকৃতি জানাল।
প্রবীণ শিল্পীদের পাশাপাশি এবারের উৎসবে নবীন প্রজন্মের শিল্পী, অভিনেতা-অভিনেত্রী ও পরিচালকরা তাঁদের কাজের স্বীকৃতিও পেয়েছেন। ফলে অভিজ্ঞতা এবং নতুন প্রতিভা-দুই প্রজন্মের শিল্পীদের একই মঞ্চে সম্মানিত করার সুযোগ তৈরি হয়।
তারকাখচিত সমাপনী অনুষ্ঠানে বিশিষ্ট অতিথিরা
সমাপনী অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন স্বামী সুপর্ণানন্দ মহারাজ, অঞ্জন বসু, প্রদীপ চোপড়া, ড. পবিত্র সরকার, ড. তড়িৎ কুমার দত্ত, ড. পঙ্কজ রায়-সহ বিশিষ্ট ব্যক্তিত্বরা।
এছাড়াও দেশের বিভিন্ন প্রান্তের পাশাপাশি বিদেশ থেকেও চলচ্চিত্র নির্মাতা ও চলচ্চিত্র জগতের সঙ্গে যুক্ত বিশিষ্ট ব্যক্তিরা অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন।
ফলে সমাপনী অনুষ্ঠান শুধু পুরস্কার বিতরণের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকেনি; চলচ্চিত্র, সংস্কৃতি এবং নতুন প্রতিভাকে ঘিরে একটি আন্তর্জাতিক সাংস্কৃতিক মিলনমেলার আবহ তৈরি হয়েছিল।
নতুনদের জন্যও ছিল বড় মঞ্চ
SVIFF-এর এবারের আয়োজনের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক ছিল নবীন চলচ্চিত্র নির্মাতা ও শিল্পীদের কাজকে সামনে আনা।
চলচ্চিত্র উৎসবের মঞ্চে নতুন পরিচালক, অভিনেতা-অভিনেত্রী এবং কলাকুশলীদের কাজের স্বীকৃতি দেওয়া হয়। বিভিন্ন বিভাগে পুরস্কারের মাধ্যমে তাঁদের সৃষ্টিশীল প্রচেষ্টাকে সম্মান জানানো হয়।
একদিকে যেখানে বাংলা ও ভারতীয় চলচ্চিত্রের প্রবীণ শিল্পীদের জীবনব্যাপী অবদানকে সম্মান জানানো হয়েছে, অন্যদিকে নতুন প্রজন্মের নির্মাতাদেরও দেওয়া হয়েছে নিজেদের প্রতিভা তুলে ধরার সুযোগ।
বিশ্বমঞ্চে উৎসবকে পৌঁছে দেওয়ার পরিকল্পনা
সমাপনী অনুষ্ঠানে উৎসবের ডিরেক্টর পল্লব রায় ভবিষ্যতে স্বামী বিবেকানন্দ আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবকে আরও বড় পরিসরে নিয়ে যাওয়ার পরিকল্পনার কথা জানান।
উৎসবকে বিশ্বমঞ্চে আরও প্রসারিত করার লক্ষ্য নিয়েই আগামী দিনে কাজ করার পরিকল্পনা রয়েছে বলে জানান তিনি। ফলে ভবিষ্যতে SVIFF-এর পরিধি আরও বাড়তে পারে এবং আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র নির্মাতা ও শিল্পীদের অংশগ্রহণও আরও বৃদ্ধি পাওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হচ্ছে।
শুধু পুরস্কার নয়, চলচ্চিত্রকে মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়ার উদ্যোগ
দশ দিনের এই উৎসবের দিকে ফিরে তাকালে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলির একটি হয়ে ওঠে চলচ্চিত্র প্রদর্শনের বিস্তৃত পরিসর।
শহরের অডিটোরিয়াম থেকে প্রান্তিক গ্রামের দর্শক-চলচ্চিত্রকে আরও বেশি মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়ার যে উদ্যোগ উৎসবের মাধ্যমে নেওয়া হয়েছে, তা এই আয়োজনকে শুধুমাত্র একটি পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠান থেকে আলাদা করে।
১৪ সেপ্টেম্বরের সমাপনী অনুষ্ঠানে প্রবীণ শিল্পীদের সম্মান, নতুন প্রতিভার স্বীকৃতি এবং ভবিষ্যতে আন্তর্জাতিক পরিসরে উৎসবকে নিয়ে যাওয়ার পরিকল্পনা-সব মিলিয়ে এবারের স্বামী বিবেকানন্দ আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসব শেষ হল এক বর্ণময় অধ্যায়ের মধ্য দিয়ে।
মঞ্চে তখন একদিকে বাংলা চলচ্চিত্রের অতীত ও ঐতিহ্যের প্রতিনিধিরা, অন্যদিকে ভবিষ্যতের সম্ভাবনাময় মুখগুলি। আর সেই দুই প্রজন্মকে একই ছাদের নিচে এনে সম্মান জানানোর মধ্য দিয়েই শেষ হল দশ দিনের এই চলচ্চিত্র-উৎসবের যাত্রা।